ঢাকা ০১:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাঞ্ছারামপুরে ১৩ বছর ধরে শেকলে বন্দী প্রতিবন্দ্বী কামরুল

ফয়সল আহমেদ খান,বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকেঃ

নাম কামরুল ইসলাম। বয়স বড়জোড় ২০ বছর। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে শেকলে বন্দী জীবন কাটছে ছেলেটির। ১০ বছর ধরে তাকে লোহার তৈরী শেকলে বেধে রাখা হয়েছে একটি গাছের সাথে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার পৌরসভা ও পৌর মেয়রের বাড়ির কাছেই কামরুলকে বেধে রাখা হয়েছে।তাকে যেখানে শেকল দিয়ে দিনরাত ২৪ ঘন্টা বেধে রাখা হয়েছে তার ১০০গজ দূরে ব্র্যাক,আশা,উদ্দীপন,সিডো নামে দেশের বড়সড়ো এনজিও অফিসও রয়েছে।

শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য
কামরুলকে একটি মাঝ বয়সী গাছে সাথে বেধে রাখা হয়েছে।তার মা ছাড়া আশেপাশে কেউ নেই।জানা গেছে,রাত ১০ টায় তাকে শেকলসহ জরাজীর্ণ তাদের রান্নাঘরের একপাশে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বানানো ছোট্ট একটি মাচায় শুইয়ে রাখা হয় কামরুলকে।শীত এলে দেয়া হয় গায়ে ছেঁড়া কাঁথা। আর তার পায়ে লোহার শেকল বেঁধে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে।

এমন অবস্থায় থাকতে থাকতে মুখে ঘাসহ শরীরের বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন রোগ। দেখে বুঝার উপায় নেই তার মানসিক সমস্যা। সবাইকে দেখে উঠে বসে একবার সে তাকাল গলায় বাধা শেকলের দিকে। তারপর করুণদৃষ্টিতে সবার দিকে চেয়ে থাকলো খানিক সময়।

কামরুলের অসহায় ও দিনমজুর পিতা কামাল মিয়া জানান, কামরুলের বয়স যখন সাত তখন তার টাইফয়েড জ¦র হয়।জ¦রের আগে সে আর ১০টা ছেলের মতো হাসতো-খেলতো।জ¦রের পরই সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবসাদ তাকে গ্রাস করে। তারপরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আস্তে আস্তে পরিণত হয় মানসিক রোগীতে।

কথা বলে জানা গেছে,মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর কিছুদিন টোটকা চিকিৎসা করানোর পর আর্থিক অনটনের কারণে বন্ধ হয়ে যায় কামরুলের চিকিৎসা।বহু এনজিও অফিসে সাহায্যেও জন্য গিয়েছেন,লাভ হয়নি।এখন আর যান না।কামরুলের অবস্থার অবনতি হলে গত ১৩ বছর ধরে তাকে শিকলবন্দী করে রাখেন তার বাবা ও মা। গলায় শেকল না বাধলে কামরুল অজানা স্থানে চলে যায় ও বিভিন্ন গাছের পাতা,বাকল খেয়ে ফেলে।কামরুলের মা বলেন, আমাদের অভাবের সংসার।কামরুলের পিতা কাজ পেলে এক বেলা ভাত জোটে।নইলে নয়।
কামরুলের মা নাছিমা আরো বলেন,কামরুলকে নিয়ে সাংবাদিকরা মজা করেন।তার ছবি ছাপায়।হেরপর আর কোনো খবর নাই।মাঝে মধ্যে দুই/তিনজন কিছু সাহায্য করেছিলো।হেই টাকায় ঢাকায় ডাক্তারের কাছে যাওন যায়,চিকিৎসা করানো যায় না।কিন্তু,আমি তো আমার ছেলেকে ফেলে দিতে পারি না।ও-গলায় শেকলবন্দী ও তীব্র শীতে যতোটা কষ্ট পায়,আমি শিকলবিহীন-ই তারচে বেশী মানসিক কষ্ট পাই’।

দিনমজুর কামাল মিয়া বলেন, “শেকল ছাড়া থাকলে ছেলে কোথায় চলে যায় ঠিক নাই। প্রথম দিকে কবিরাজ দেখাইছি কিন্তু কোনো কাজ না হওয়ায় ডাক্তার দেখাই। কিন্তু টাকার অভাবে বেশিদিন তার চিকিৎসা করাতে পারি নাই। মাঝেমাঝে কিছু কিছু ওষুধ কিনে খাওয়াইছি। ওষুধ খাওয়াইলে কিছুটা ভালো থাকে, না খাওয়াইতে পারলে পাগলামি বেড়ে যায়। গবির মানুষ আমি, কারো কাছ থেকে কখনো কোনো সাহায্য পাই নাই। কেউ যদি সাহায্য করতো তাহলে হয়তো ছেলেটা সুস্থ হইত।”
প্রতিবেশী বিল্লাল মিয়া বলেন, “শিশুকাল থেকেই ছেলেটার কষ্ট। ছেলেটার এমন বন্দিজীবন দেখলে খুবই খারাপ লাগে। বিত্তবানরা যদি তার সাহায্যে এগিয়ে আসতো কিংবা সরকারি কোনো মহল যদি তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিত তাহলে মেয়েটা আবারও সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারতো।”

এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর পৌর মেয়র খলিলুর রহমান টিপু মোল্লা বলেন, “কামরুলকে বহুদিন ধরে  শেকলে বেঁধে রাখছে তার পরিবার,বিষয়টি আমি অবগত।আমি সরকারিভাবে কোন সাহায্য করতে পারি কি-না বিষয়টি আমি চেষ্টা করবো।”

কুমিল্লার দর্পন নামে বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের কর্নধার গোলাম মহিউদ্দিন জীবন বলেন, “তাকে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে আমরা চিকিৎসার করাতে পারি।এ ধরনের রোগী ভালো হয়।সময় লাগে।খবরও একটু বেশী।”

ট্যাগস
আপলোডকারীর তথ্য

বাঞ্ছারামপুরে ১৩ বছর ধরে শেকলে বন্দী প্রতিবন্দ্বী কামরুল

আপডেট সময় ০৭:০৫:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭
ফয়সল আহমেদ খান,বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকেঃ

নাম কামরুল ইসলাম। বয়স বড়জোড় ২০ বছর। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে শেকলে বন্দী জীবন কাটছে ছেলেটির। ১০ বছর ধরে তাকে লোহার তৈরী শেকলে বেধে রাখা হয়েছে একটি গাছের সাথে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার পৌরসভা ও পৌর মেয়রের বাড়ির কাছেই কামরুলকে বেধে রাখা হয়েছে।তাকে যেখানে শেকল দিয়ে দিনরাত ২৪ ঘন্টা বেধে রাখা হয়েছে তার ১০০গজ দূরে ব্র্যাক,আশা,উদ্দীপন,সিডো নামে দেশের বড়সড়ো এনজিও অফিসও রয়েছে।

শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য
কামরুলকে একটি মাঝ বয়সী গাছে সাথে বেধে রাখা হয়েছে।তার মা ছাড়া আশেপাশে কেউ নেই।জানা গেছে,রাত ১০ টায় তাকে শেকলসহ জরাজীর্ণ তাদের রান্নাঘরের একপাশে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বানানো ছোট্ট একটি মাচায় শুইয়ে রাখা হয় কামরুলকে।শীত এলে দেয়া হয় গায়ে ছেঁড়া কাঁথা। আর তার পায়ে লোহার শেকল বেঁধে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে।

এমন অবস্থায় থাকতে থাকতে মুখে ঘাসহ শরীরের বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন রোগ। দেখে বুঝার উপায় নেই তার মানসিক সমস্যা। সবাইকে দেখে উঠে বসে একবার সে তাকাল গলায় বাধা শেকলের দিকে। তারপর করুণদৃষ্টিতে সবার দিকে চেয়ে থাকলো খানিক সময়।

কামরুলের অসহায় ও দিনমজুর পিতা কামাল মিয়া জানান, কামরুলের বয়স যখন সাত তখন তার টাইফয়েড জ¦র হয়।জ¦রের আগে সে আর ১০টা ছেলের মতো হাসতো-খেলতো।জ¦রের পরই সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবসাদ তাকে গ্রাস করে। তারপরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আস্তে আস্তে পরিণত হয় মানসিক রোগীতে।

কথা বলে জানা গেছে,মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর কিছুদিন টোটকা চিকিৎসা করানোর পর আর্থিক অনটনের কারণে বন্ধ হয়ে যায় কামরুলের চিকিৎসা।বহু এনজিও অফিসে সাহায্যেও জন্য গিয়েছেন,লাভ হয়নি।এখন আর যান না।কামরুলের অবস্থার অবনতি হলে গত ১৩ বছর ধরে তাকে শিকলবন্দী করে রাখেন তার বাবা ও মা। গলায় শেকল না বাধলে কামরুল অজানা স্থানে চলে যায় ও বিভিন্ন গাছের পাতা,বাকল খেয়ে ফেলে।কামরুলের মা বলেন, আমাদের অভাবের সংসার।কামরুলের পিতা কাজ পেলে এক বেলা ভাত জোটে।নইলে নয়।
কামরুলের মা নাছিমা আরো বলেন,কামরুলকে নিয়ে সাংবাদিকরা মজা করেন।তার ছবি ছাপায়।হেরপর আর কোনো খবর নাই।মাঝে মধ্যে দুই/তিনজন কিছু সাহায্য করেছিলো।হেই টাকায় ঢাকায় ডাক্তারের কাছে যাওন যায়,চিকিৎসা করানো যায় না।কিন্তু,আমি তো আমার ছেলেকে ফেলে দিতে পারি না।ও-গলায় শেকলবন্দী ও তীব্র শীতে যতোটা কষ্ট পায়,আমি শিকলবিহীন-ই তারচে বেশী মানসিক কষ্ট পাই’।

দিনমজুর কামাল মিয়া বলেন, “শেকল ছাড়া থাকলে ছেলে কোথায় চলে যায় ঠিক নাই। প্রথম দিকে কবিরাজ দেখাইছি কিন্তু কোনো কাজ না হওয়ায় ডাক্তার দেখাই। কিন্তু টাকার অভাবে বেশিদিন তার চিকিৎসা করাতে পারি নাই। মাঝেমাঝে কিছু কিছু ওষুধ কিনে খাওয়াইছি। ওষুধ খাওয়াইলে কিছুটা ভালো থাকে, না খাওয়াইতে পারলে পাগলামি বেড়ে যায়। গবির মানুষ আমি, কারো কাছ থেকে কখনো কোনো সাহায্য পাই নাই। কেউ যদি সাহায্য করতো তাহলে হয়তো ছেলেটা সুস্থ হইত।”
প্রতিবেশী বিল্লাল মিয়া বলেন, “শিশুকাল থেকেই ছেলেটার কষ্ট। ছেলেটার এমন বন্দিজীবন দেখলে খুবই খারাপ লাগে। বিত্তবানরা যদি তার সাহায্যে এগিয়ে আসতো কিংবা সরকারি কোনো মহল যদি তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিত তাহলে মেয়েটা আবারও সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারতো।”

এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর পৌর মেয়র খলিলুর রহমান টিপু মোল্লা বলেন, “কামরুলকে বহুদিন ধরে  শেকলে বেঁধে রাখছে তার পরিবার,বিষয়টি আমি অবগত।আমি সরকারিভাবে কোন সাহায্য করতে পারি কি-না বিষয়টি আমি চেষ্টা করবো।”

কুমিল্লার দর্পন নামে বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের কর্নধার গোলাম মহিউদ্দিন জীবন বলেন, “তাকে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে আমরা চিকিৎসার করাতে পারি।এ ধরনের রোগী ভালো হয়।সময় লাগে।খবরও একটু বেশী।”