রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি:
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় চার শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী ঐতিহ্যবাহী রায়দিঘী আজ দখল ও অবৈধ ভরাটের কারণে অস্তিত্ব হারানোর দ্বারপ্রান্তে। এক সময় প্রায় ১৫ একর আয়তনের এই প্রাচীন জলাধারটি এখন সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ একরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে পরিকল্পিত কৌশলে রাতের আঁধারে দিঘির ভেতরে ইট ভাটার রাবিশ ও ভাঙা ইট ফেলে ধীরে ধীরে এটি ভরাট করা হচ্ছে, যেন কেউ টের না পায়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিকল্পিত ও কৌশলী উপায়ে দীর্ঘদিন ধরে দিঘিটি ভরাট করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে মাঝেমধ্যে একটি করে ট্রাক এসে দিঘির নির্দিষ্ট অংশে বিল্ডিং ভাঙার রাবিশ ও ভাঙা ইট ফেলে রেখে যায়। এরপর কয়েক দিন এলাকায় নীরবতা বজায় রাখা হয়, যাতে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে না পড়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেই আবার একই স্থানে আরেকটি ট্রাক এনে ফেলা হয় নির্মাণ বর্জ্য।
এভাবে ‘এক ট্রাক–এক বিরতি’ কৌশল অবলম্বন করে বছরের পর বছর ধরে ধাপে ধাপে দিঘিটির প্রায় ৬ একর এলাকা ভরাট করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই দীর্ঘসূত্রতা ও গোপনীয়তার কারণে শুরুতেই দখল ও ভরাটের বিষয়টি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে একসময় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের আগেই বিশাল জলাধারটি কার্যত বিলীন হওয়ার পথে চলে গেছে।
রায়দিঘীর অবস্থান মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের নগরপাড় এলাকায়। স্থানীয়ভাবে এটি নগরপাড় দিঘি নামেও পরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১০ সালে তৎকালীন তিন জমিদার, ঢাকার জদুলাল বসাক, বাঙ্গরার রূপক চন্দ্র এবং নগরপাড়ের রামদেব রায়ের উদ্যোগে দিঘিটি খনন করা হয়। নগরপাড়ের জমিদার রায় বংশের নামানুসারেই এর নামকরণ হয় রায়দিঘী।
তবে স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিঘিটির উৎপত্তি আরও পুরোনো—মোগল আমল কিংবা তার কিছু পরবর্তী সময়ের। চার শতাব্দী ধরে এটি শুধু একটি জলাধার নয়, বরং পুরো এলাকার জীবন-জীবিকার কেন্দ্র ছিল।
একসময় গ্রামের মানুষ গোসল, রান্না, কৃষি সেচ ও মাছ চাষসহ নানা কাজে রায়দিঘীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক মিলনমেলা ও উৎসবে দিঘির পাড় ছিল মানুষের আড্ডাস্থল। আজ সেই ইতিহাস চোখের সামনে ধ্বংস হতে বসেছে।
রায়দিঘী রক্ষায় ২০১২ সালে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী উচ্চ আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় আদালত পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিঘিতে কোনো ধরনের ভরাট কার্যক্রম বন্ধ রাখার আদেশ দেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যত উপেক্ষা করেই দখল ও ভরাট অব্যাহত রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দিঘিটির সরকারি খাস জমি (হালট) দখল ও ভরাটের পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিঘির পাশেই নিজেদের কিছু ব্যক্তিগত জমি থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে পুরো জলাধারটি দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, প্রথমে দিঘির একাংশ ভরাট শুরু করা হলেও ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হচ্ছে। এতে শুধু সরকারি খাস জমি দখলই নয়, শতাব্দীপ্রাচীন জলাধারটির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে সংশ্লিষ্টরা।
নগরপাড় এলাকার বাসিন্দা চন্দন বনিক ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এই দিঘিটি কেবল পানির আধার নয়, এটি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী। শতাব্দীপ্রাচীন স্মৃতি আজ চোখের সামনে একে একে মুছে যাচ্ছে, অথচ দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। যারা প্রকাশ্যে দিঘি দখল করে পরিবেশ ও ইতিহাস ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছি।
পরিবেশবিদদের মতে, রায়দিঘী এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। দিঘি ভরাটের ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে পানির তীব্র সংকট। এতে কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় ইউপি’র সদস্য রাম প্রসাদ দেবনাথ বলেন, রায় দিঘিটি আমাদের এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী জলাশয়। এটি রক্ষা করা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণেরও অংশ। দিঘি দখল ও ভরাটের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি জোর দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের জলাধার সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিক দিঘি-পুকুর দখল ও ভরাট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খতিয়ানে জলাধার হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকা সত্ত্বেও নজরদারির অভাবে দখলকারীরা প্রকাশ্যেই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে কোনো জলাশয়, দিঘি কিংবা খাল ভরাটের সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও জলাশয় পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কুমিল্লা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজীব বলেন, জলাশয় ভরাট সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে
দিঘি ভরাট বন্ধ, দখলকৃত অংশ উদ্ধার এবং রায়দিঘীকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী জলাধার ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই ইতিহাস থেকে মুছে যাবে মুরাদনগরের চার শতকের এই রায়দিঘী।
রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি: 

















