একদিকে সবুজে মোড়া তিন ফসলি জমি, অন্যদিকে সেই জমির বুক চিরে ফসল ফলানোর জমিতে বসানো হয়েছে ড্রেজার। কোথাও মাটি কাটার চিহ্ন, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। ড্রেজারের পাইপ চলে গেছে কৃষিজমির ভেতর দিয়ে। কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলার পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের কুড়াখাল এলাকায় প্রায় ছয় একর কৃষিজমি থেকে চার বছর ধরে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জমির মালিকদের অভিযোগ, এ কাজে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। উত্তোলিত মাটি পাইপের মাধ্যমে পাশের কাগাতুয়া গ্রামের কৃষিজমিতে নিয়ে ভরাট করে বসতবাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানায় লিখিত অভিযোগের পর সরেজমিনে নায়েবকে পাঠানো হয়েছে। ড্রেজারটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া অভিযোগে পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কুড়াখাল এলাকার জমির মালিক আখতারুজ্জামান অভিযোগ করেন, আবু তাহের নামের এক ব্যক্তি ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন করছেন। অভিযোগে খতিয়ান নম্বর ৪৯২ এবং দাগ নম্বর ২০৮৫, ২০৮৬, ২০৮৭, ২০৮৮ ও ২১০৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত গভীর করে মাটি কাটার কারণে আশপাশের জমির পাড় ধসে পড়তে পারে। এতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি বর্ষায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে অভিযোগে ঠিক কতটুকু জমি থেকে কত গভীরতায় মাটি কাটা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ উল্লেখ নেই। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে সরেজমিন পরিমাপ এবং ভূমি রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১২ আগস্ট বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দেন আখতারুজ্জামান, কিবরিয়া সরকার, আবদুল হাকিম ও মো. হামিদ মিয়া। অভিযোগে বলা হয়, কুড়াখাল গ্রামের ফসলি জমি থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আবু তাহেরকে ড্রেজারের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও কয়েকজনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে কুড়াখাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিন ফসলি কৃষিজমির মধ্যে একটি ড্রেজার স্থাপন করে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজারের পাইপ দিয়ে উত্তোলিত মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাইপের মাধ্যমে এসব মাটি কাগাতুয়া এলাকায় নিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাটি উত্তোলনের ফলে কৃষিজমির একটি অংশ গভীর জলাশয়ের মতো হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কুড়াখাল ও কুরুন্ডি মৌজার মধ্যবর্তী বিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন চলছে। তাঁদের প্রশ্ন, কৃষিজমির এত কাছে দীর্ঘ সময় ধরে মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে কি না এবং থাকলে সেই অনুমোদনের শর্তগুলো কী। স্থানীয়দের দাবি, কুড়াখাল এলাকার মৃত হানিফ খাঁর ছেলে আবু তাহের সেখানে ড্রেজার মেশিন স্থাপন করে দীর্ঘদিন ধরে মাটি ও বালু উত্তোলন করছেন। এতে আশপাশের তিন ফসলি জমির স্বাভাবিক গঠন, উর্বরতা ও ভবিষ্যৎ চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করবে এবং কৃষিজমি ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়লে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
তবে ড্রেজিংয়ের অনুমোদন নেই স্থানীয়দের এমন দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত আবু তাহেরের কাছ থেকেও অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো কাগজ পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৭ক ধারায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে মাটি বা বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রেও কৃষিজমির উর্বরতা ও উপরিভাগের উর্বর মাটি সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড্রেজিংয়ের ফলে পার্শ্ববর্তী জমির ক্ষতি বা ধসে পড়ার আশঙ্কার বিষয়টিও বিবেচনার মধ্যে রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খান পাপ্পু বলেন, গত পাঁচ বছরে মুরাদনগর ও বাঙ্গরা উপজেলার ফসলি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৬১ হেক্টর থেকে কমে ২৩ হাজার ৯১৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে ফসলি জমি কমেছে ১৪৭ হেক্টর।
তিনি বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত থাকলে মাটির গুণগত মান ও উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি ও এর উর্বর উপরিভাগের মাটি সংরক্ষণে নজরদারি জরুরি।
বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কুড়াখাল এলাকায় নতুন করে ড্রেজার চালুর বিষয়টি আমার জানা নেই। সেখানে ড্রেজিং কার্যক্রম চলার তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন বলেন, কুড়াখাল এলাকায় ড্রেজার স্থাপনের বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে স্থানীয় নায়েবকে পাঠানো হয়েছে। ড্রেজারটি সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপরও সেখানে ড্রেজার চালিয়ে মাটি উত্তোলন করা হলে বিষয়টি আর ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।
কুড়াখালে আসলে কতটুকু কৃষিজমি থেকে মাটি তোলা হয়েছে, কত গভীর পর্যন্ত কাটা হয়েছে এবং উত্তোলিত মাটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ। দাগ-খতিয়ান ও জমির শ্রেণি যাচাই, মাটি কাটার পরিমাণ পরিমাপ, ড্রেজার পরিচালনার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা এবং মাটির গন্তব্য সরেজমিনে খতিয়ে দেখলেই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। স্থানীয়দের দাবি, কৃষিজমির ক্ষতি হয়ে থাকলে তা বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধিঃ 








