ঢাকা ০২:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চার বছরেও বন্ধ হয়নি ড্রেজিং

বাঙ্গরায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিন ফসলি জমির বুক চিরে ড্রেজিং

রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলার পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের কুড়াখাল এলাকায় তিন ফসলি কৃষিজমির বুক চিরে দীর্ঘ চার বছর ধরে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় জমির মালিকদের দাবি, প্রায় ছয় একর কৃষিজমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে কৃষিজমির স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের জমিও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় চার বছর ধরে একই এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম চললেও এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কৃষিজমিতে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং চলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পরও যদি তা বন্ধ করা না যায়, তাহলে প্রশাসনের নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—একজন ব্যক্তি কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেন আগে তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি?

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, উত্তোলিত মাটি ড্রেজারের পাইপের মাধ্যমে পাশের কাগাতুয়া এলাকায় নিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অন্যত্র মাটি ফেলে নতুন করে জমি ভরাট করা হচ্ছে।

গত ১৭ আগস্ট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কুড়াখাল এলাকার জমির মালিক আখতারুজ্জামান অভিযোগ করেন, আবু তাহের নামের এক ব্যক্তি ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন করছেন।

অভিযোগে খতিয়ান নম্বর ৪৯২ এবং দাগ নম্বর ২০৮৫, ২০৮৬, ২০৮৭, ২০৮৮ ও ২১০৬ উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত গভীর করে মাটি কাটার কারণে আশপাশের জমির পাড় ধসে পড়তে পারে। এতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তবে অভিযোগে ঠিক কতটুকু জমি থেকে কত গভীরতায় মাটি কাটা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ উল্লেখ নেই। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে সরেজমিন পরিমাপ ও ভূমি রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গত ১২ আগস্ট বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দেন আখতারুজ্জামান, কিবরিয়া সরকার, আবদুল হাকিম ও মো. হামিদ মিয়া।

অভিযোগে বলা হয়, কুড়াখাল গ্রামের ফসলি জমি থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আবু তাহেরকে ড্রেজারের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও কয়েকজনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনের কথাও উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্ত আবু তাহেরের কাছ থেকেও অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো কাগজ পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খান পাপ্পু বলেন, গত পাঁচ বছরে মুরাদনগর ও বাঙ্গরা উপজেলার ফসলি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৬১ হেক্টর থেকে কমে ২৩ হাজার ৯১৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে ফসলি জমি কমেছে ১৪৭ হেক্টর।

তিনি বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত থাকলে মাটির গুণগত মান ও উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি ও এর উর্বর উপরিভাগের মাটি সংরক্ষণে নজরদারি জরুরি।

বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কুড়াখাল এলাকায় নতুন করে ড্রেজার চালুর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। সেখানে ড্রেজিং কার্যক্রম চলার তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন বলেন, কুড়াখাল এলাকায় ড্রেজার স্থাপনের বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে স্থানীয় নায়েবকে পাঠানো হয়েছে। ড্রেজারটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও সেখানে ড্রেজার চালিয়ে মাটি উত্তোলন করা হলে বিষয়টি আর ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

বাঙ্গরায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিন ফসলি জমির বুক চিরে ড্রেজিং

চার বছরেও বন্ধ হয়নি ড্রেজিং

বাঙ্গরায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিন ফসলি জমির বুক চিরে ড্রেজিং

আপডেট সময় ০৭:১১:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলার পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের কুড়াখাল এলাকায় তিন ফসলি কৃষিজমির বুক চিরে দীর্ঘ চার বছর ধরে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় জমির মালিকদের দাবি, প্রায় ছয় একর কৃষিজমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে কৃষিজমির স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের জমিও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় চার বছর ধরে একই এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম চললেও এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কৃষিজমিতে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং চলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পরও যদি তা বন্ধ করা না যায়, তাহলে প্রশাসনের নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—একজন ব্যক্তি কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেন আগে তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি?

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, উত্তোলিত মাটি ড্রেজারের পাইপের মাধ্যমে পাশের কাগাতুয়া এলাকায় নিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অন্যত্র মাটি ফেলে নতুন করে জমি ভরাট করা হচ্ছে।

গত ১৭ আগস্ট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে পশ্চিম বাঙ্গরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কুড়াখাল এলাকার জমির মালিক আখতারুজ্জামান অভিযোগ করেন, আবু তাহের নামের এক ব্যক্তি ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন করছেন।

অভিযোগে খতিয়ান নম্বর ৪৯২ এবং দাগ নম্বর ২০৮৫, ২০৮৬, ২০৮৭, ২০৮৮ ও ২১০৬ উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত গভীর করে মাটি কাটার কারণে আশপাশের জমির পাড় ধসে পড়তে পারে। এতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তবে অভিযোগে ঠিক কতটুকু জমি থেকে কত গভীরতায় মাটি কাটা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ উল্লেখ নেই। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে সরেজমিন পরিমাপ ও ভূমি রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গত ১২ আগস্ট বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দেন আখতারুজ্জামান, কিবরিয়া সরকার, আবদুল হাকিম ও মো. হামিদ মিয়া।

অভিযোগে বলা হয়, কুড়াখাল গ্রামের ফসলি জমি থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আবু তাহেরকে ড্রেজারের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও কয়েকজনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনের কথাও উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্ত আবু তাহেরের কাছ থেকেও অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো কাগজ পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খান পাপ্পু বলেন, গত পাঁচ বছরে মুরাদনগর ও বাঙ্গরা উপজেলার ফসলি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৬১ হেক্টর থেকে কমে ২৩ হাজার ৯১৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে ফসলি জমি কমেছে ১৪৭ হেক্টর।

তিনি বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত থাকলে মাটির গুণগত মান ও উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি ও এর উর্বর উপরিভাগের মাটি সংরক্ষণে নজরদারি জরুরি।

বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কুড়াখাল এলাকায় নতুন করে ড্রেজার চালুর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। সেখানে ড্রেজিং কার্যক্রম চলার তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন বলেন, কুড়াখাল এলাকায় ড্রেজার স্থাপনের বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে স্থানীয় নায়েবকে পাঠানো হয়েছে। ড্রেজারটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও সেখানে ড্রেজার চালিয়ে মাটি উত্তোলন করা হলে বিষয়টি আর ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।