রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি:
দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বদিউল আলম ডিগ্রি কলেজে অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় কলেজ পরিচালনা পর্ষদের গঠন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও নির্বাচনকে ঘিরে এবারও সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কলেজটিতে প্রায় দুই দশক ধরে অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে পরিচালনা পর্ষদের গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এ অবস্থায় সম্প্রতি নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে অভিভাবকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, অভিভাবক প্রতিনিধি পদে শুরুতে ১০ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই হঠাৎ করে তিনজনকে অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
কিছু অভিভাবকের অভিযোগ, উৎকোচের বিনিময়ে পূর্বনির্ধারিতভাবে তিনজনকে প্রতিনিধি করার চেষ্টা করা হয় এবং নির্বাচন আয়োজন না করে ‘সিলেকশন’ পদ্ধতিতে তাদের নির্বাচিত দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন ঘিরে প্রায় ৯ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগও উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনজন প্রার্থীকে বিজয়ী করতে গোপনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচন এড়াতে বাকি ছয়জন প্রার্থীকে প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তবে এ প্রক্রিয়ায় প্রার্থী আব্দুস সাত্তার বাবু (গুঞ্জর) টাকা গ্রহণে অসম্মতি জানান এবং সরাসরি নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলেন। তার অবস্থানের কারণে বিষয়টি ধীরে ধীরে স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং পরে গণমাধ্যমেও বিষয়টি উঠে আসে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়লে ‘সিলেকশন’ পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরে নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মোট ২,০৫৩ জন ভোটারের মধ্যে ৪২৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফলে ৩ জন প্রার্থী অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭ নম্বর ব্যালটে ২২৬ ভোট পেয়ে আবদুস সাওার বাবু প্রথম স্থান অর্জন করেন। এছাড়া ২ নম্বর ব্যালটে ১৭৫ ভোট পেয়ে মোঃ আলমাস উদ্দিন দ্বিতীয় এবং ১ নম্বর ব্যালটে ১৫৫ ভোট পেয়ে মোঃ গোলাম মোস্তফা তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
পরাজিত অন্য প্রার্থীদের মধ্যে মোঃ মনির হোসেন ১২৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ, মির্জা মনিরুল হক ৭৪ ভোট পেয়ে পঞ্চম, মোঃ মনিরুল ইসলাম ৬৮ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ, সেলিম মিয়া ৩৩ ভোট পেয়ে সপ্তম এবং ইব্রাহিম সরকার ৩০ ভোট পেয়ে অষ্টম স্থান অর্জন করেন।
নির্বাচন চলাকালীন পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন কলেজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে। অভিভাবকদের সরাসরি অংশগ্রহণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কলেজের (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম।
অভিযোগের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, টাকা-পয়সার লেনদেনের বিষয়টি কলেজের বাইরে হয়েছে। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সিলেকশনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং শিক্ষাঙ্গনের সুশাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ।
তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে পুনঃনির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।
রায়হান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি: 














