ঢাকা ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার স্থাপনা

দাউদকান্দিতে ১৯ বছরেও চালু হয়নি ‘শহীদনগর ট্রমা সেন্টার’

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলা ট্রমা সেন্টারটি একসময় আশার আলো জ্বালিয়েছিল হাজারো মানুষের মনে। উদ্দেশ্য ছিল- সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা দেওয়া, যেন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হার কমে আসে। কিন্তু প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি। কোটি টাকায় নির্মিত এই হাসপাতাল এখন কেবল আউটডোর সেবায় সীমাবদ্ধ, ভেতরে নীরবতা আর ধ্বংসের চিহ্ন।
গণপূর্ত বিভাগের অর্থায়নে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল। ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর বিএনপি জোট সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এটি উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী আ.ন.ম রুহুল হক আবারও উদ্বোধন করেন নতুন করে আশার বাণী শোনাতে। কিন্তু সেই আশার আলো নিভে গেছে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই।
উদ্বোধনের পরপরই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ সেবা। বর্তমানে হাসপাতালটি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সীমিত আউটডোর সেবা দেয়। এরপর গেটে তালা পড়ে, নিভে যায় চিকিৎসার বাতি। অথচ প্রতিদিন মহাসড়কে ঘটে দুর্ঘটনা, আহতদের আর্তনাদে কেঁপে ওঠে বাতাস- কিন্তু শহীদনগর ট্রমা সেন্টারের দরজা থাকে বন্ধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবনের নিচতলায় চলছে সামান্য চিকিৎসা কার্যক্রম। বাকি দুটি তলায় ছড়িয়ে আছে অবহেলার চিহ্ন- খসে পড়েছে পলেস্তারা, দরজা-জানালায় মরিচা, ঘরজুড়ে ধুলো ও অন্ধকার। কখনো আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্মিত আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার এখন অচল ও পরিত্যক্ত।
১৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে এখনো শূন্য অর্ধেকেরও বেশি। অর্থো-সার্জারি, এ্যানেসথেসিয়া, সিনিয়র নার্স ও ফার্মাসিস্ট- সব জায়গায় জনবল সংকট। বর্তমানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চারজন স্টাফ কোনোরকমে চালাচ্ছেন কাজ।
নিরাপদ চিকিৎসা চাই কুমিল্লা জেলা শাখা কমিটির সভাপতি, কবি ও কলামিস্ট মো. আলী আশরাফ খান যায়যায়দিন-কে বলেন, “প্রতিদিন মহাসড়কে রক্ত ঝরছে, অথচ পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃস্তব্ধ ট্রমা সেন্টার এটা কষ্টদায়ক ও লজ্জাজনক। শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এখন সময়ের দাবি, মানবতারও দাবি। একটি কার্যকর ট্রমা সেন্টার গড়ে উঠলে শুধু আহতদের জীবনই নয়, বাঁচবে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।”
ট্রমা সেন্টারের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ নাজমুল আলম যায়যায়দিনকে বলেন, “প্রতিদিন এখানে অর্ধশতাধিক রোগী আসে। একা আমার পক্ষে সবার চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন, তবু আমি আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করি যেন কোনো রোগী ফিরিয়ে না দেওয়া হয়। অনেকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় আসেন- তাদের সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদি ট্রমা সেন্টারের ইনডোর কার্যক্রম চালু থাকত, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল থাকত, তবে অনেক আহত রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো এখানে। এই সেন্টারটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়-এটি মহাসড়কের জীবনরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্জীবিত হওয়া উচিত।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, “আমরা চাই শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি সম্পূর্ণভাবে চালু হোক। এখানকার আধুনিক ভবন, আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার ব্যবহারযোগ্য করতে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও জনবল পাওয়া গেলে দ্রুতই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক অবহেলা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে আজ অচল এই হাসপাতাল। শহীদনগর বাজারের ব্যবসায়ী জামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুপুর দুইটার পর হাসপাতালের গেইট বন্ধ হয়ে যায়, ডাক্তার থাকেন না। মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে আহতদের কুমিল্লা বা ঢাকায় নিতে হয়। অনেকেই রাস্তাতেই মারা যান।”
একইভাবে চিকিৎসা নিতে আসা রাশিদা বেগম বলেন, “দূরদূরান্ত থেকে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে, কিন্তু হাসপাতালের এই অচলাবস্থা আমাদের হতাশ করে।”
ষোলোপাড়ার মো. আসলাম মিয়া যোগ করেন, “এ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অসংখ্য জীবন বাঁচানো সম্ভব।”
দীর্ঘ ১৯ বছরের স্থবিরতায় ধ্বংস হচ্ছে কোটি টাকার স্থাপনা, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের আস্থা। অথচ সামান্য মনোযোগ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলেই এই ট্রমা সেন্টারটি হতে পারে মহাসড়কের প্রাণরক্ষাকারী হাসপাতাল।
স্থানীয়দের একটাই দাবি- “রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এখন দরকার মানবতার প্রয়াস। কোটি টাকায় নির্মিত এই ট্রমা সেন্টারটি যেন আর ধ্বংস না হয় অবহেলায়। দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে আহতদের জীবন বাঁচানোর পথ খুলে দিন। প্রতিদিন এই মহাসড়কে যেন আর কোনো প্রাণ হারাতে না হয় চিকিৎসাহীনতায়-শহীদনগর ট্রমা সেন্টার আবার হোক আশার আলো, জীবনের ভরসা।”

মুরাদনগরে রাতের আঁধারে পুকুরে বিষ, সর্বস্বান্ত মাছচাষি

অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার স্থাপনা

দাউদকান্দিতে ১৯ বছরেও চালু হয়নি ‘শহীদনগর ট্রমা সেন্টার’

আপডেট সময় ০৪:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলা ট্রমা সেন্টারটি একসময় আশার আলো জ্বালিয়েছিল হাজারো মানুষের মনে। উদ্দেশ্য ছিল- সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা দেওয়া, যেন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হার কমে আসে। কিন্তু প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি। কোটি টাকায় নির্মিত এই হাসপাতাল এখন কেবল আউটডোর সেবায় সীমাবদ্ধ, ভেতরে নীরবতা আর ধ্বংসের চিহ্ন।
গণপূর্ত বিভাগের অর্থায়নে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল। ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর বিএনপি জোট সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এটি উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী আ.ন.ম রুহুল হক আবারও উদ্বোধন করেন নতুন করে আশার বাণী শোনাতে। কিন্তু সেই আশার আলো নিভে গেছে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই।
উদ্বোধনের পরপরই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ সেবা। বর্তমানে হাসপাতালটি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সীমিত আউটডোর সেবা দেয়। এরপর গেটে তালা পড়ে, নিভে যায় চিকিৎসার বাতি। অথচ প্রতিদিন মহাসড়কে ঘটে দুর্ঘটনা, আহতদের আর্তনাদে কেঁপে ওঠে বাতাস- কিন্তু শহীদনগর ট্রমা সেন্টারের দরজা থাকে বন্ধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবনের নিচতলায় চলছে সামান্য চিকিৎসা কার্যক্রম। বাকি দুটি তলায় ছড়িয়ে আছে অবহেলার চিহ্ন- খসে পড়েছে পলেস্তারা, দরজা-জানালায় মরিচা, ঘরজুড়ে ধুলো ও অন্ধকার। কখনো আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্মিত আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার এখন অচল ও পরিত্যক্ত।
১৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে এখনো শূন্য অর্ধেকেরও বেশি। অর্থো-সার্জারি, এ্যানেসথেসিয়া, সিনিয়র নার্স ও ফার্মাসিস্ট- সব জায়গায় জনবল সংকট। বর্তমানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চারজন স্টাফ কোনোরকমে চালাচ্ছেন কাজ।
নিরাপদ চিকিৎসা চাই কুমিল্লা জেলা শাখা কমিটির সভাপতি, কবি ও কলামিস্ট মো. আলী আশরাফ খান যায়যায়দিন-কে বলেন, “প্রতিদিন মহাসড়কে রক্ত ঝরছে, অথচ পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃস্তব্ধ ট্রমা সেন্টার এটা কষ্টদায়ক ও লজ্জাজনক। শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এখন সময়ের দাবি, মানবতারও দাবি। একটি কার্যকর ট্রমা সেন্টার গড়ে উঠলে শুধু আহতদের জীবনই নয়, বাঁচবে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।”
ট্রমা সেন্টারের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ নাজমুল আলম যায়যায়দিনকে বলেন, “প্রতিদিন এখানে অর্ধশতাধিক রোগী আসে। একা আমার পক্ষে সবার চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন, তবু আমি আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করি যেন কোনো রোগী ফিরিয়ে না দেওয়া হয়। অনেকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় আসেন- তাদের সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদি ট্রমা সেন্টারের ইনডোর কার্যক্রম চালু থাকত, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল থাকত, তবে অনেক আহত রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো এখানে। এই সেন্টারটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়-এটি মহাসড়কের জীবনরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্জীবিত হওয়া উচিত।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, “আমরা চাই শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি সম্পূর্ণভাবে চালু হোক। এখানকার আধুনিক ভবন, আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার ব্যবহারযোগ্য করতে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও জনবল পাওয়া গেলে দ্রুতই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক অবহেলা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে আজ অচল এই হাসপাতাল। শহীদনগর বাজারের ব্যবসায়ী জামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুপুর দুইটার পর হাসপাতালের গেইট বন্ধ হয়ে যায়, ডাক্তার থাকেন না। মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে আহতদের কুমিল্লা বা ঢাকায় নিতে হয়। অনেকেই রাস্তাতেই মারা যান।”
একইভাবে চিকিৎসা নিতে আসা রাশিদা বেগম বলেন, “দূরদূরান্ত থেকে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে, কিন্তু হাসপাতালের এই অচলাবস্থা আমাদের হতাশ করে।”
ষোলোপাড়ার মো. আসলাম মিয়া যোগ করেন, “এ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অসংখ্য জীবন বাঁচানো সম্ভব।”
দীর্ঘ ১৯ বছরের স্থবিরতায় ধ্বংস হচ্ছে কোটি টাকার স্থাপনা, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের আস্থা। অথচ সামান্য মনোযোগ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলেই এই ট্রমা সেন্টারটি হতে পারে মহাসড়কের প্রাণরক্ষাকারী হাসপাতাল।
স্থানীয়দের একটাই দাবি- “রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এখন দরকার মানবতার প্রয়াস। কোটি টাকায় নির্মিত এই ট্রমা সেন্টারটি যেন আর ধ্বংস না হয় অবহেলায়। দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে আহতদের জীবন বাঁচানোর পথ খুলে দিন। প্রতিদিন এই মহাসড়কে যেন আর কোনো প্রাণ হারাতে না হয় চিকিৎসাহীনতায়-শহীদনগর ট্রমা সেন্টার আবার হোক আশার আলো, জীবনের ভরসা।”